সংবাদ প্রতিবেদন লেখার নিয়ম

সংবাদ প্রতিবেদন লেখার নিয়ম সম্পর্কে আমরা অনেকে প্রায়ই দ্বিধায় পড়ে যাই। অনেকেই প্রতিবেদন লেখার ধাঁচটা ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না। আজ আমরা এ বিষয়েই কথা বলবো। কিভাবে সংবাদ প্রতিবেদন লেখা উচিত, কোন্ ধরনের তথ্য কোথায় ব্যবহার করা উচিত, ধাঁচটাই বা কী হবে- ইত্যাদি তথ্য আজ আমরা আপনাদের জানাবো।

ব্যবহারের উপর ভিত্তি করে প্রতিবেদন অনেক ধরনের হয়ে থাকে। যেমন- প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন, তদন্ত প্রতিবেদন, তথ্যভিত্তিক বা অ্যানালিটিকেল প্রতিবেদন, সংবাদ প্রতিবেদন ইত্যাদি। এগুলোর মধ্যে সংবাদ প্রতিবেদন আমাদের প্রায় সারা জীবনই কাজে লাগে।

শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাংবাদিক, এমনকি শিক্ষক কিংবা বিভিন্ন অফিসের পদস্থ কর্মকর্তাদেরকে প্রায়শই এ ধরনের প্রতিবেদন লিখতে হয়। এ কারণেই সংবাদ প্রতিবেদনকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের সিলেবাসে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।

তাহলে চলুন দেরী না করে শেখা যাক সংবাদ প্রতিবেদন লেখার নিয়ম!!!

সংবাদ প্রতিবেদন লেখার ফরম্যাট

এ ধরনের প্রতিবেদন পেশা ভেদে বিভিন্ন ফরম্যাটে হয়ে থাকে। যেমন- এক জন শিক্ষার্থী যেভাবে লিখবে, এক জন পেশাদার সাংবাদিক হয়তো সেই ফরম্যাটে লিখবেন না। তবে ফরম্যাট যেমনই হোক না কেন, প্রতিবেদন লেখার মূল নিয়ম বা Core Topic একই ধাঁচের হয়ে থাকে। 

এক জন পেশাদার সাংবাদিক প্রতিবেদন লেখার সময় সরাসরি মূল প্রতিবেদন লিখে ফেলেন। আবার, এক জন সাধারণ নাগরিক যখন প্রতিবেদন লিখে সেটা পত্রিকায় প্রকাশ করতে চান, তখন সেটা প্রকাশের অনুরোধ সহ আলাদা একটা চিঠি বা দরখাস্ত সাথে দিতে হয়।

আবার, এক জন শিক্ষার্থী যখন সিলেবাসের অংশ হিসেবে সংবাদ প্রতিবেদন লিখবে, তখন সাধারণভাবে প্রকাশের অনুরোধ সহ চিঠি বা দরখাস্ত লিখতে হয় না। কিন্তু, প্রশ্নে যদি প্রকাশের অনুরোধ/আবেদন সহ লিখতে বলা হয়, তবে সে নির্দেশনা অনুযায়ী লিখতে হবে। 

প্রতিবেদন লেখার সময়, শিরোনাম, নিজের নাম (বা “নিজস্ব প্রতিবেদক”), এলাকার নাম, তারিখ ইত্যাদি সংযুক্ত করতে হবে।

সংবাদ প্রতিবেদন লেখার নিয়ম

বুঝানোর সুবিধার্থে এ ধরনের প্রতিবেদন লেখার নিয়মকে ২ টি অংশে ভাগ করে নিচ্ছি। একটা বাহ্যিক নিয়ম, আরেকটা অন্তঃস্থ নিয়ম বা লেখার কৌশল। 

বাহ্যিক নিয়মের মধ্যে বোঝানোর চেষ্টা করবো, কিভাবে আপনি একটা প্রতিবেদন শুরু করবেন, কী কী তথ্য অন্তভূক্ত করবেন, কী কী করবেন না ইত্যাদি। “লেখার কৌশল” সেকশনে বলবো, প্রতিবেদনে কোন্ ধাপে আপনি ঠিক কোন্ ধরনের তথ্য প্রদান করবেন।

বাহ্যিক নিয়ম

শিরোনাম

সংবাদ প্রতিবেদন লেখার সময় শুরুতেই ১ টি আকর্ষণীয় শিরোনাম দিতে হয়। আকর্ষণীয় শিরোনাম দেয়ার নিয়ম নিয়ে বলতে গেলে আসলে বিশাল একটা লেকচার হয়ে যাবে। তাছাড়া এ নিয়ে বেশি গভীরে গেলে সেটা জার্নালিজম বিষয়ের হায়ার স্টাডি হয়ে যাবে। তাই বেশি ব্যাখ্যা না করেই বলার চেষ্টা করবো।

আকর্ষণীয় শিরোনামের মাধ্যমে মূলত মানুষকে প্রতিবেদনটি পড়ার জন্য আকৃষ্ট করা হয়। মানুষ শিরোনাম দেখে আগ্রহী হলে, তবেই পুরো প্রতিবেদনটি পড়ে। একইভাবে, আকর্ষণীয় শিরোনাম দিতে পারলে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। অর্থাৎ, শিরোনাম কী দেয়া হবে- সেটা নিয়ে একটু চিন্তা করতে হবে।

আমাদের দেশে শিরোনামকে আকর্ষণীয় করতে গিয়ে বিভিন্ন অনৈতিক পন্থা ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে ইউটিউবিং বা ব্লগিং এর ক্ষেত্রে এ ধরনের মিসলিডিং টাইটেল বেশি ব্যবহৃত হয়। এসব অতি রঞ্জিত বা অতি চটকদার শিরোনাম মানুষকে বিরক্ত করে তোলে। তাই অতি রঞ্জন না করেই, শিরোনামকে আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে।

আমি ৩ টি উদাহরণ দিচ্ছি। 

১। সড়ক দুর্ঘটনায় ৩ শিক্ষার্থীর মৃত্যু

২। সড়ক দুর্ঘটনায় শেষ হয়ে গেলো ৩ শিক্ষার্থীর জীবন

৩। দেখুন, কিভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা পড়লো ৩ শিক্ষার্থী

এখানে আমি একই কথাকেই ৩ রকম ভাবে লিখেছি। প্রথম শিরোনামটি অতি সাধারণ, যেটা হয়তো বেশিরভাগ মানুষই ব্যবহার করবে। দ্বিতীয় শিরোনামটি একটু আকর্ষণীয়, যেটা একই বিষয়কে উপস্থাপন করছে। কিন্তু, ২য় শিরোনামটির কারণে মানুষ কিছুটা আকৃষ্ট হবে। 

কিন্তু, ৩য় শিরোনামটি খেয়াল করলে দেখা যাবে- এটা অতি রঞ্জিত। এ ধরনের শিরোনাম দেখেই মানুষ প্রতিবেদনটি পড়তে আগ্রহী হবে। কিন্তু, প্রতিবেদন পড়া শেষে নিরাশ হতে হবে। কারণ, শিরেনামে যতটা অতি রঞ্জিত করা হয়েছে, প্রতিবেদনের ভেতরের ততটা মশলা নেই। 

শিরোনাম নিয়ে কথা এতটুকুই। শিরোনাম হতে হবে আকর্ষণীয়, ভেতরের কথার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বাস্তব। শিরোনামের উপরই পাঠকের আগ্রহ অনেকাংশে নির্ভর করে।

তথ্য

প্রতিবেদনের ভেতর সাধারণত কোনো ঘটনার সময়, স্থান, কারণ, ঘটনা প্রবাহ ইত্যাদি উল্লেখ থাকে। সংবাদ প্রতিবেদনে- কী, কখন, কোথায়, কেন, কিভাবে ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর পাঠকের কাছে ফুটিয়ে তুলতে হয়। 

যদি প্রতিবেদন কোনো বিগত ঘটনা নিয়ে করা হয়, তখন সেটার বিবরণ, সময়, স্থান, ঘটার কারণ, ঘটনার ক্রমধারা ইত্যাদি উল্লেখ করতে হয়। আর যদি ভবিষ্যতের ঘটনা ঘটে, তাহলে ভবিষ্যতে কখন ঘটতে পারে, কোথায় ঘটবে, কারা ঘটাবে, ঘটার কারণ কী হতে পারে, ফলাফল কী হতে পারে- ইত্যাদি তথ্য উল্লেখ থাকবে।

যদি সামাজিক কোনো বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন লেখা হয়, সেক্ষেত্রে উক্ত বিষয়ের বিবরণ, কারণ, ফলাফল, প্রস্তাবনা ইত্যাদি উল্লেখ করতে হয়। সামাজির সমস্যার ক্ষেত্রে প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং সামাজিক উন্নতির ক্ষেত্রে উৎসাহমূলক বাক্য যোগ করা যেতে পারে।

একটা সংবাদ প্রতিবেদনে কী কী তথ্য যুক্ত করতে হবে, কী কী যুক্ত করা যাবে না? এর উত্তর পেতে হলে আপনাকে পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গিতে ভাবতে হবে। যে বিষয়ে প্রতিবেদন লিখবেন, সে বিষয়ে আপনি যদি পাঠক হতেন, তবে কী কী তথ্য জানতে চাইতেন? এভাবে পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলেই আপনি সহজে বুঝতে পারবেন- কী লিখবেন আর কী লিখবেন না।

লেখার কৌশল/অন্তঃস্থ নিয়ম

প্রতিবেদনের শিরোনাম দেখে মানুষ বিস্তারিত পড়তে আসে। বিস্তারিত পড়ার সময় মানুষ প্রথম প্যারা পড়ার পর সাধারণত আর পড়তে চায় না। তাই প্রতিবেদনের প্রথম প্যারা এমনভাবে লিখতে হবে, যেন মানুষ ঐ বিষয়ে যেটা জানতে চাচ্ছে, সেটাও জানতে পারে; আবার কোনো অজানা বিষয় বা টুইস্ট এর টানে বাকি প্রতিবেদনটাও পড়তে ইচ্ছুক হয়।

এ বিষয়টা আয়ত্ত করতে বড় বড় সাংবাদিকরাও হিমশিম খান। তাই যাঁরা প্রতিবেদন লেখা সবে শুরু করেছেন, তাঁরা এ বিষয়টা নিয়ে বেশি মাথা না ঘামানোই ভালো।

প্রতিবেদনের প্রথম প্যারাতে সাধারণত ঘটনার খুবই সংক্ষিপ্ত বিবরণ, সময় ও স্থান উল্লেখ থাকে। ২য় প্যারাতে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেয়া যেতে পারে। তৃতীয় প্যারাতে ঘটনার কারণ দেয়া যেতে পারে। ৪র্থ প্যারায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের বক্তব্য কিংবা ঘটনার ফলাফল কিংবা ইভেন্টের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত দেয়া যেতে পারে।

সব শেষে ঘটনার উপর প্রস্তাবনা দেয়া যেতে পারে। কেন এ ধরনের ঘটনা হওয়া উচিত, কিংবা কেন উচিত নয়, কিংবা কিভাবে বৃদ্ধি বা প্রতিরোধ করা যায়, ইত্যাদি প্রস্তাবনার মধ্যে যুক্ত করা যেতে পারে। 

শেষ কথা

আজ আমরা সংবাদ প্রতিবেদন লেখার নিয়ম জানতে পারলাম। বাস্তবতা হচ্ছে, সংবাদ প্রতিবেদন লেখা শিখতেই এক জন সাংবাদিক সারা টা জীবন পার করে দেন। তাই প্রতিবেদন লেখার নিয়ম বা পদ্ধতি শেখার শেষ নেই, কেবল শুরু আছে। 

প্রতিবেদন লেখা শুরুর পর কোন্ নিয়মগুলো অনুসরণ করে এগোনো যেতে পারে, কেবল সেগুলোই আমরা আলোচনা করতে পারি। আজ আমরা প্রতিবেদন লেখার যেসব কৌশল আলোচনা করেছি, এগুলো অনুসরণ করলে আশা করি- শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে চাকুরীজীবী বা চাকুরীপ্রার্থীরাও উপকৃত হবেন। 

আমাদের আজকের আলোচনা এ পর্যন্তই। “সংবাদ প্রতিবেদন লেখার নিয়ম” শিরোনামে আমাদের আজকের লেখাটা ভালো লাগলে শেয়ার করবেন। কমেন্টে আপনার মূল্যবান মতামত জানাতে ভুলবেন না। সবার সুস্বাস্থ্য কামনা করে এখানেই শেষ করছি।